Archive for June, 2009

একটি মৃত আত্মা

অফিস থেকে ফিরছিলাম। রোজকার মতই চরম বিরক্তি আর ক্লান্তি নিয়ে। বাস থেকে নেমে কোন রিকশা পাওয়া যায় না। হেঁটেই বাসা পর্যন্ত আসছিলাম। অন্ধকার, ভাঙ্গা ফুটপাথ মাড়িয়ে। হাঁটার ক্লান্তি দূর করার জন্য নিজের মধ্যেই মগ্ন হয়ে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করেই সামনে কি যেন পড়ায় থমকে দাঁড়াতে হল। সেই ভাঙ্গা ফুটপাথের অন্ধকারেই একটা মানুষ। প্রায় উলংগ। শুয়ে আছে। ঘুমিয়ে আছে?

বাস গুলো রাস্তায় পার্ক করা শুরু করার পর থেকে এই ফুটপাথটা খারাপ হয়ে গেছে। নেশাখোরদের আখড়া হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই তেমন কেউ। মাত্রাতিরিক্ত নেশা করে বেহুঁশ হয়ে আছে। আমাদের এই ঘুনে ধরা দেশে এইসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছুই নেই। পড়ে আছে, সকালে উঠে চলে যাবে। পড়ে থাকা শরীরটা ডিঙ্গিয়ে চলে আসলাম। কিন্তু তবুও কেন যেন মনে হল, মরে গেছে মানুষটা।

একবার ভাবলাম পুলিশ কে একটা ফোন করে দিলেই তো হয়। ওরাই যা করার করবে। তবু কেন যেন করলাম না।

সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখলাম লোকটাকে। তখনও ফোন করলাম না। কেন করলাম না? দায়িত্ব থেকে পালিয়ে গেলাম??

সত্যিই কি পালিয়ে যেতে পেরেছিলাম? সারাদিনই মনের মধ্যে একটা কিসের যেন খোঁচা লাগছিল! সন্ধ্যায় ফেরার পথে আবারও বাঁধা। এবার তার পাশে কয়েকজন পুলিশও আছে। জিজ্ঞেশ করে জানতে পারলাম, বেওয়ারিশ লাশ, তাই আঞ্জুমানের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। কেমন যেন একটা কষ্টবোধ ভেতরে। কেন কালই কোন ব্যবস্থা নিলাম না? তাহলে হয়ত মৃত মানুষটাকে দুইটা দিন রাস্তায় পড়ে থাকতে হত না।

আচ্ছা, এই মানুষটার জন্মের সময় কেউ কি ভাবতে পেরেছিল তার এমন পরিণতি হবে? তার মা হয়ত কত আদরেই না আগলে রাখত ছোট্ট বাচ্চাটাকে। তার জীবনের এত গুলো বছরে সে নিজে কি কখনো ভেবেছিল? আচ্ছা, কার উপর তার এত অভিমান ছিল যে নেশার হাতে নিজেকে সপে দিয়ে জীবনের এমন পরিণতি টেনে আনল? কিসের এত অভিমান ছিল তার?

তাকে যদি ঈশ্বর জিজ্ঞেশ করে কার প্রতি তোমার এত অভিমান? সেই তালিকায় আমার নামটাও কি থাকবে না? হয়ত সর্বশেষ নামটা হবে আমার। সে হয়ত অভিমান করে বলবে, সেদিন সন্ধ্যায়ই যদি কোন ব্যবস্থা নিতাম, তাহলে তার মৃতদেহটা নর্দমার পাশে দুই দিন পরে থাকত না।

একটা সন্ধ্যা

অনেক দিন পর আজ বৃষ্টির সাথে দেখা। হঠাৎ করেই এসে সামনে হাজির। তার এমন অপরূপ রূপ বহুদিন হল দেখি না। আজকাল তার সাথে দেখাই হয় না। খবরই রাখিনা কখন এসে সে ফিরে চলে যায়। আসলেই অনেক বদলে গেছি আমি। তাইতো এত নিষ্ঠুর হতে পারি! তোমায় বলেছিলাম না, বৃষ্টি আমার প্রথম প্রেম। আমি তোমাকে বলেছিলাম, সে আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে।

হতে পারে অনেক নিষ্ঠুর হয়ে গেছি আমি। ভেতরটা পাথর হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরও আজ যখন ওকে দেখলাম মনটা কেমন যেন করে উঠল। কেন বলতো? আমার তো বিচলিত হবার কথা না!! কিন্তু ওকে দেখেই ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা পাগলটা যেন লাফিয়ে উঠল! এতদিনের সাধনায় পাগলটাকে ঘুম পাড়িয়েছিলাম!! কিন্তু ওর একটা ডাকেই সে জেগে উঠল!

জান? আজ অফিস থেকে বের হবার সাথে সাথেই ধুলি মেশানো দমকা বাতাসটা যখন ধাক্কা দিল, তখনই মনটা কেমন যেন করে উঠেছিল। সবকিছুই যেন ছিল একদম গোছানো! আজ আমার সাথে তার দেখা হবার জন্য!! গুলশান নেমে যখন রিকশাওয়ালাকে ভাংতির অভাবে ভাড়া দিতে পারছিলাম না, তখন একটুও বিরক্ত লাগেনি। নিজে থেকেই দোকানে গেলাম ভাংতি করতে!!! তুমি ভাবতে পারো? আমি ফুরফুরে মনে রিকশাওয়ালার জন্য টাকা ভাংতি করতে জাচ্ছি? যখন দোকানীটা টাকা গুনে দেওয়ার সময় গল্প করে আমার দেরি করিয়ে দিচ্ছিল, তখনো বিরক্ত হইনি! মজা করে তার গল্প শুনছিলাম! যেন কোনই তাড়া নেই আজ আমার!

তখনও কি জানতাম তার সাথে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য এটা প্রকৃতির একটা সাজানো খেলা!! আচ্ছা, যদি জানতাম, তাহলে কি আমি পালিয়ে চলে আসতাম? কি করতাম আমি বল তো? তুমি তো আমাকে বেশ চেন।

রাস্তাটা পার হয়ে গুলশান মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়েছি আর বৃষ্টির ডাক শুনতে পেলাম। প্রথমে বিশ্বাসই হতে চাচ্ছিল না! বৃষ্টি আমাকে ডাকছে? আমি ওকে এত অবহেলা করার পরেও? আর জানো, আমি না এবার উপেক্ষা করতে পারলাম না! হঠাৎ করেই পাগলটা জেগে উঠল। সামান্যতম চিন্তা করার সুযোগও আমাকে দিল না! ছুটে চলে গেল ওর কাছে।

তারপর অনেকটা পথ আজ হেঁটেছি ওর সাথে। কিন্তু জানো কার কথা ভাবছিলাম তখন? অবিশ্বাস্য!! আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম!! কি নিষ্ঠুর রকমের ধোঁকাবাজ আমি! বৃষ্টির সাথে হাঁটছি আর ভাবছি তোমার কথা! কিন্তু কি করব বলো? সারাক্ষন মনে হচ্ছিল, এমন একটা সন্ধ্যা তুমি আমার কাছে অনেক চেয়েছ। কিন্তু না না অজুহাতে আমি তোমায় দেইনি। কিন্তু আজ বৃষ্টি একবার ডাকতেই ওকে দিয়ে দিলাম?

এর ঘন্টা খানেক পরে যখন কাঁপতে কাঁপতে বাসায় ঢুকলাম, তখনো তুমি মাথার ভিতরে। বৃষ্টির স্নিগ্ধ ছোঁয়া সারা গায়ে। কিন্তু তবুও অস্বস্তি… স্যান্ডেলটা পুরোনো হয়ে গেছে। রাস্তার কাঁদা পানিতে চপচপ করছে। তোমার দেওয়া নীল টি-শার্ট টায় হয়ত দাগ পরে যাবে। তোমার দেওয়া ব্যাগটা চুঁইয়ে পানি ধুকেছে ভেতরে। মোবাইলটা ভিজে গেছে। মাথাটা ব্যাথা করছে খুবই।

আচ্ছা বলতো তোমাকে এমন একটা সন্ধ্যা দিলে কি এমন ক্ষতি হত? আসলে এটাই হয়ত ভালোবাসা।

আমি তোমাকে বলেছিলাম, সে আমাকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তুমি বলেছিলে, না হতেই পারে না। বৃষ্টি তোমাকে সবচে বেশি ভালবাসে। তোমার কথাই ঠিক জানো? নাহলে সে আসলে শুধু তোমারই কথা কেন মনে করিয়ে দেয়?

Search
Categories